আকাশে মেঘের ঘনঘটা আর বাতাসের তীব্রতা বাড়লেই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার ৮৬ নম্বর তারাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শুরু হয় হুড়োহুড়ি। প্রাণ বাঁচাতে জরাজীর্ণ একাডেমিক ভবন ছেড়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা দৌড়ে গিয়ে আশ্রয় নেন বিদ্যালয়ের শৌচাগার—ওয়াস ব্লকে।
শনিবার (২ মে) দুপুরে কালবৈশাখী ঝড় শুরু হলে আবারও দেখা যায় এই চরম আতঙ্কের দৃশ্য। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের ছাদ ধসে পড়ার ভয়ে পাঠদান বন্ধ করে দিয়ে খুদে শিক্ষার্থীদের নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটেন শিক্ষকরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, দীর্ঘদিনের পুরোনো এই ভবনটির দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ফাটল ধরেছে। ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে নিয়মিত, আর কাঠামোগত দুর্বলতা এতটাই প্রকট যে ভবনটি এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কায় সামান্য দুর্যোগেই সবাই ক্লাস বন্ধ করে ওয়াস ব্লকে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন বলে বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে।
শনিবার ঝড়ের পর বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষক ওয়ালিউল্লাহ হাওলাদার বলেন, ‘আজ দুপুরে ঝড় শুরু হতেই আমরা শিক্ষার্থীদের দ্রুত ওয়াস ব্লকে সরিয়ে নেই। ভবনটি এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ যে সেখানে বসে ক্লাস নেওয়া এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা করা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।’
জানা গেছে, কয়েক মাস আগে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মঈনুল হক বিদ্যালয়টির এই করুণ দশা দেখে একটি টিনশেড ঘর নির্মাণের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছিলেন। সেই অনুযায়ী এলজিইডি’র প্রকৌশলী ‘ইস্টিমেট’ বা খরচের তালিকা প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, ইউএনও বদলি হওয়ার পরপরই উপজেলা প্রকৌশলী শফিউল আজম সেই বরাদ্দটি বাতিল করে দেন।
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে শিক্ষক ওয়ালিউল্লাহ হাওলাদার বলেন, ‘আগের ইউএনও স্যার বরাদ্দের পর কাজের ইস্টিমেটও হয়েছিল। কিন্তু তিনি বদলি হতেই উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার বরাদ্দ বাতিল করে দেন। আমরা পরবর্তীতে ঘর নির্মাণের জন্য তার কাছে গেলে তিনি আমাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। ওই সময়ে ঘরটি নির্মাণ হলে আজ আমাদের এই চরম আতঙ্কের মধ্যে পড়তে হতো না।’
জরুরি এই বরাদ্দ বাতিলের খবরে অভিভাবকদের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাদের দাবি, শিশুদের জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করে এমন জনগুরুত্বপূর্ণ বরাদ্দ বাতিল করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এ বিষয়ে বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাগুফতা হক্ বলেন, ‘ঘটনাটি আমি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। দ্রুত বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যা যা প্রয়োজন সেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া কেন টিনশেড ঘর নির্মাণের বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে, সেটিও গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হবে।’
বর্তমানে চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী দ্রুত একটি টিনশেড ঘর নির্মাণসহ স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন, যাতে আগামী দিনে ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে কোনো শিশুকে ওয়াস ব্লকে আশ্রয় নিতে না হয়।